সুস্বাস্থ্য.কম

সুস্থ্য দেহ ও সতেজ মনের জন্য...

  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size

ডি. আই. সি. (Disseminated intravascular coagulation)

E-mail Print

ডি আই সি একটি রোগের সংক্ষিপ্ত রূপ, যার পুরো নাম ডেসিমিনেটেড ইন্ট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন (disseminated intravascular coagulation)কেউ কেউ একে কনজাম্পশন কোয়াগুলোপ্যাথি (consumption coagulopathy) বলেও ডাকেন। সাধারণত আমাদের শরীরের ছোট খাট কোন অংশে কেটে গেলে নিজে নিজেই সে স্থানের রক্ত জমাট বেধে বা ক্লট (Clot) হয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। রক্তের শ্বেত কনিকা (Platelet-প্লাটেলেট) এবং কোয়াগুলেশন ফ্যাক্টর (coagulation / clotting factor) নামক এক ধরনের রক্তের প্রোটিন সহজাত প্রক্রিয়ায় এই কাজটি করে থাকে।

DIC খুব পরিচিত কোন রোগ নয় -কিন্ত অনেক জটিল রোগেই  চুড়ান্ত অসুস্থ্য কোন রোগীর বিভিন্ন অঙ্গগুলো একে একে রোগাক্রান্ত হয়ে যখন ফেইলুর এর দিকে যেতে থাকে চিকিৎসকগণ অনেক সময়ই নিকটাত্মীয়দের জানিয়ে দেন যে রোগীর DIC হয়েছে, এখন অপেক্ষা করা ছাড়া তেমন কিছু করার নেই

ডি,আই,সি হলে আসলে কি হয়? এটা হলে রক্ত নালীর মধ্যেই রক্ত জমাট বাধতে শুরু করে,অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্লট তৈরী হয়। এই প্রচুর পরিমানে clot গুলো তৈরী হতে রক্তের অধিকাংশ প্লাটেলেট এবং ক্লটিং ফ্যাক্টর ব্যবহৃত হয়ে যায়, যার ফলে তখন শরীরের ক্ষুদ্র কোন অংশ কেটে গেলে তা থেকে অবিরাম ধারায় রক্তপাত হতে থাকে আর তা কোন অবস্থাতেই বন্ধ করা যায় না। এজন্যই এর অন্য নাম consumption coagulopathyএর মাত্রা যখন বেড়ে যায় তখন যেকোন কাটা স্থান এমনকি ইঞ্জেকশন দেয়ার স্থান থেকেও অবিরত রক্তপাত কোন ভাবেই বন্ধ করা যায়না এমন অবস্থায় অনেক সময়ই রোগীর আত্মীয়-স্বজন জানতে পারেন যে শরীরের সকল স্থান দিয়ে রক্তপাত হয়ে রোগী মারা গেছেন।

তবে DIC ধীরে ধীরেও শরীরে বাসা বাঁধতে পারে, যেমন জমাট বাধা রক্ত বা ক্লট গুলো যদি অল্প মাত্রার হয় তবে তা বিভিন্ন অঙ্গ যেমন কিডনী, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ইত্যাদিতে জমাট বাধতে থাকে এবং সে অংগ গুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। এভাবে রোগীর জরুরী অংগ গুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে একসময় রোগীর প্রায় সকল অংগ গুলোই নষ্ট হয়ে যায় এবং রোগী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।

সব রোগ হলেই যে DIC হয় তা কিন্ত নয়, সাধারনত  অগ্নাশয় (pancrease), প্রস্টেট (prostate), পাকস্থলী (stomach), লিউকেমিয়া (leukaemia) এসবের ক্যান্সার হলে DIC হবার প্রবনতা খুবই বেশী দেখা যায়। তাছাড়া বাচ্চা জন্মদানের সময় গর্ভবতী মায়ের এক্লাম্পসিয়া (eclampsia, preeclampsia), এব্রাসিও প্লাসেন্টা (abruptio placentae), এম্নিওটিক ফ্লুইড এম্বোলিজম (amniotic fluid embolilsm), বড় কোন ধরনের দুর্ঘটনা, আগুনে পুড়ে যাওয়া, বিষাক্ত সাপের কামড়, ম্যালারিয়া ইত্যাদি কারনেও DIC হতে পারে। অনেক সময় বড় কোন অপারেশন /সার্জারি, ইনফেকশন (SEPSIS),শক, হিট স্ট্রোক (Heat stroke) ইত্যাদি কারনেও রোগী DIC রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করতে পারে।

DIC রোগী যেহেতু সাধারণত হাসপাতালেই ভর্তি থাকে তাই এ রোগের উপসর্গ বা পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে রোগীকে খুব বেশী ভাবতে হয়না। এজন্যই হয়তো চিকিৎসকের  জন্য ব্যাপারটা খুবই জটিল হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু এ রোগ হলে শরীরের ক্লটিং ফ্যাক্টর ও প্লাটেলেট এর বিশাল অংশ ব্যবহৃত হয়ে যায় তাই রক্তে এ দুটির (coagulation factor & platelets counts) মাত্রা খুব কম থাকে আর তাই তা কেমন আছে তা বার বার যেনে নিতে হয় এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজন হলে বাইরে থেকে তা রোগীর শরীরে রক্তনালীর মাধ্যমে (I.V- intravenous) দেয়া হয়। DIC রোগে রক্তে প্রথমবিন টাইম (PT-Prothombin time) এবং এক্টিভেটেড পার্শিয়াল থ্রম্বপ্লাস্টিন টাইম (APTT-Activated partial thromboplastin time) এর মাত্রা খুব বেশী থাকে এবং ডি-ডাইমার (D-dimer) সহ বিভিন্ন ফিব্রিন ডিগ্রেডেশন প্রডাক্ট (FDP- fibrin degradation product/fibrin splitting product) এর মাত্রা বেশ বেড়ে যায়। অন্য দিকে ফিব্রিনোজেন (Fibrinogen) উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যায়।

DIC যতো জটিল রোগই হোক তাই বলে কি এর কোন চিকিৎসা থাকবেনা ? অন্যান্য রোগের মতো এ রোগেরও চিকিৎসা আছে। তবে একটা কথা ভালো মতো জেনে রাখা ভালো এই ধরনের রোগীকে অবশ্যই আই,সি,ইউ (ICU) তে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে হবে, কারন সার্বক্ষনিক নিবিড় পর্যবেক্ষন এ রোগীর জীবন বাচানোর জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য্য। চিকিৎসার প্রথম এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো যে রোগের কারনে ডি,আই,সি হয়েছে তার কারন নির্নয় করে প্রথমে তার চিকিৎসা করা এবং জটিলতা কমানো। এর পরের পর্যায়ের চিকিৎসার পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া নিয়ে অল্পকিছু মতভেদ থাকলেও যে সকল রোগীর প্লাটেলেটের মাত্রা বেশ কম থাকে তাদের অবশ্যই প্লাটেলেট Transfuse করতে হয়। কখনো কখনো রক্তজমাট না বাধার উপাদান (Anticoagulant) দিতে হয়; আবার ক্ষেত্র বিশেষে রক্ত জমাট বাধার উপাদান ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (FFP- Fresh Frozen Plasma) ও দেয়া লাগতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এর পুরোটাই নির্ভর করবেন যে চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন তার বিবেচনার উপর। তবে এক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকগন বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ীই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

শেষ পর্যন্ত একটা কথা না বললেই নয় -ডি,আই,সি অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ঠিক আগের অবস্থান টির নাম। যদিও অনেক ক্ষেত্রে শতকরা মাত্র ১০ ভাগ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত রোগী এর হাত থেকে বেচে আসতে পারেন তবুও কারো এ রোগ হলে রোগীর আত্মীয় বা নিকটজনদের খুব সাহসী পদক্ষেপ ও অপরিসীম ধৈর্যের পরিচয় ও বিচক্ষতা রোগীর দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে এমনকি এই ২০১২ খৃষ্টাব্দেও মানুষ সব রোগ জয় করতে পারেনি, তাই বলে কেউ থেমে নেই। একটি ভালো আই,সি,ইউ তে সর্বদাই একদল সুদক্ষ চিকিৎসক ডি,আই,সি র সাথে লড়াই করার মানসিকতা নিয়ে সদা প্রস্তত থাকে। আপনার সহযোগীতা না পেলে যে কেউ হয়তো দুর্বল মূহুর্তে হাল ছেড়ে দিতে পারে, জীবনের মূল্য সর্বাধিক মনে করে মনে অসীম সাহস রাখুন। রোগ যেমন আছে নিরাময় ও তেমনি এর পাশাপাশি অবস্থান করে,তা শক্ত হাতে হাল ধরে থাকুন।

 

সুস্বাস্থ্য সুপারিশ করুন

এই সাইটের সকল তথ্য শুধুমাত্র চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞানার্জন ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকাশিত যা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের বিকল্প নয়রোগ নির্নয় ও তার চিকিৎসার জন্য সংশ্লিস্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়