বার্ড ফ্লু (Bird flu, Avian flu)

Print

বার্ড ফ্লু হলো একধরনের ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় রোগ। ভাইরাস বাহিত এই রোগটি পাখিদের সংক্রমিত করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা নামক এই ভাইরাসটির জন্য একেক সময় বার্ড ফ্লু পাখির মহামারি হিসেবে দেখা দেয়ায় প্রান হারিয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন পাখি। বার্ড ফ্লুকে, বার্ড ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং এভিয়ান ফ্লু নামেও ডাকা হয়। পাখিরা খুব দ্রুত একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে দেখে এই রোগ পুরো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে খুব একটা সময় লাগেনা।

আর প্রকৃতিতে স্বাধীন ভাবে বিচরন করা পাখি থেকে গৃহপালিত পাখিতে এই রোগ ছড়ানোও খুব সহজ ব্যাপার, এর ফলে পোল্ট্রি ফার্মাররা প্রচুর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে বারবার, এমন কি অনেকে একদম নিঃস্ব ও হয়ে গেছে।

শুধু এতটুকু হলেও কথা ছিলোনা, পাখির এই রোগটি ছড়াতে শুরু করলো খামারিদের মধ্যেও। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের চারটি সাব টাইপ H5N1, H7N3, H7N7 এবং H9N2 মানুষের মধেও রোগ ছড়ালো ব্যাপক ভাবে, এমনকি মানুষের মৃত্যুর কারন হয়ে দাড়ালো। এর মধ্যে H5N1 ভাইরাসটি মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং বর্তমানে বার্ডফ্লু নিয়ে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য একক ভাবে এই ভাইরাসটিই দায়ী।

বার্ড ফ্লু এর লক্ষন গুলো সাধারন ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই, জ্বর আসা, ঠান্ডা লাগা, হাঁচি, কাশি, মাথা ব্যথা, শ্বাস কষ্ট এই সব। তাই হঠাৎ করেই কারো বার্ড ফ্লু হয়েছে কিনা বোঝা বড় দুস্কর। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে যেমন এই রোগ একদম স্বল্প মাত্রায় হয় তেমনি কারো কারো ক্ষেত্রে এটা দ্রুত তীব্র রূপ ধারন করে এবং রোগীর মৃত্যু বয়ে আনে। সহজ করে বললে বলতে হবে বার্ডফ্লু হলো ইনফ্লুয়েঞ্জার তীব্র একটি রূপ।

বার্ড ফ্লু পাখি থেকে মানুষে ছড়ালেও মানুষ থেকে মানুষে অত সহজে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়না তবে ইদানিং কালের মহামারি আকারে দেখা যাওয়া H5N1 ভাইরাসটি মানুষ থেকেও মানুষে ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাই কোথাও একই সাথে অনেক মানুষের যদি ফ্লু জাতীয় রোগ তীব্র মাত্রায় দেখা যায় তা হলে তাদের বার্ড ফ্লু সন্দেহ করে চিকিৎসা নেয়া শুরু করা উচিত।

বার্ডফ্লু সন্দেহ হলে রক্তে এই ভাইরাসের এন্টিবডি পি,সি,আর পদ্ধতিতে দেখে বোঝা যায় ভাইরাসটি মহামারির ভাইরাস কিনা। এছাড়া গলার পেছনের দিক থেকে ন্যাজোফেরিঞ্জিয়াল সোয়াব নিয়ে ভাইরাস কালচার করে রোগটির ব্যাপারে পূর্ন নিশ্চিত হওয়া যায়। টেমিফ্লু বা ওসেল্টামিভির নামক ভাইরাস নাশক অসুধ ব্যবহারে বার্ডফ্লুর ভাইরাস কাবু হয়ে যায়। তাই রোগের সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অসুধ সেবন শুরু করে দেয়া উচিত।

আক্রান্ত পাখিদের বিষ্ঠায় মাত্রাতিরিক্ত পরিমানে এই ভাইরাস পাওয়া যায়। তাই যারা ঘরে বিভিন্ন পাখি পালন করেন তাদের ঘরে পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে জীবানু ঢুকে যেতে পারে, শিশুরা যেহেতু যেকোন কিছু হাত দিয়ে স্পর্শ করে ফেলে তাই তাদের আক্রান্ত হবার ভয় সবচেয়ে বেশী। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম হলো হাঁচি বা কাশি থেকে নির্গত বাষ্প (Droplet, Aerosol), তাই আক্রান্ত ব্যক্তির ৫-৬ ফুট দূরে থাকলে এর সংক্রমন থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কিংবা কাশির বাষ্পকনা নিত্য ব্যবহার্য্য কোন স্থানে বা পাত্রে জমে থেকেও সংক্রমন ঘটাতে পারে। ঐ পাত্র বা স্থান (যেমন টেবিল, চেয়ার, টেলিফোন, দরজার হাতল ইত্যাদি) একজন সুস্থ্য ব্যক্তি যদি হাত দিয়ে স্পর্শ করে এবং ঐ হাত দিয়ে তার নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করে তাহলে তা থেকে সুস্থ্য ব্যক্তির বার্ড ফ্লু হতে পারে। যেহেতু জনসমাগম বেশী এসকল স্থানে কারো এই রোগ থাকতে পারে তাই ঐ সকল স্থানের কোনো কিছু স্পর্শ করে সাথে সাথে নাকে, মুখে বা চোখে হাত দেয়া যাবেনা। তবে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিলে হাতে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস থাকেনা। এজন্য জনসমাগমে বা Public place এ যেতে হয় এমন লোকজনদের দিনে বেশ কয়েকবার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

একটা প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই থাকে, বার্ড ফ্লু হলে কি মুরগীর মাংশ বা ডিম খাওয়া যাবেনা? এর উওর হলো যাবে। ৭০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের উপর তাপমাত্রায় বার্ডফ্লু এর জীবানু বেচে থাকতে পারেনা, তাই পুরো সিদ্ধ করা মাংশ বা ডিম খাওয়া যাবে। তবে মাংসের কোনো অংশ কাঁচা থাকলে বা ডিম এর কুসুমও যদি কাঁচা থেকে যায় তবে এ রোগ সংক্রমের আশংকা থেকেই যায়। রান্না করা মাংস নুতন করে বার্ডফ্লু আক্রান্ত হতে পারেনা। তবে পরিবহন এর সময় বিশেষ সতর্কতা গ্রহন করা আবশ্যক, কারন এসব ক্ষেত্রে অসতর্ক হলে বার্ডফ্লুর জীবানু রয়েই যেতে পারে।

{flike}