টার্নার্স সিন্ড্রোম (Turner’s Syndrome)

Print

টার্নার্স সিন্ড্রোম মানব দেহের ক্রোমোজমের (chromosomal disorder) একটি রোগ। পৃথিবীর প্রতি ২৫০০ মহিলাদের মাঝে একজন এমন রোগে আক্রান্ত। বোঝাই যাচ্ছে ছেলেরা এ রোগে আক্রান্ত হয়না। আসলে এ রোগ নিয়ে জন্ম নেয়া মানুষটির একটি ক্রোমোজম (chromosome) কম থাকে। একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষের যেমন ৪৬ টি ক্রোমোজম থাকে (মহিলাদের 44+XX আর পুরুষের 44+ XY) এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটির সেখানে ক্রোমোজম থাকে ৪৫ টি (44+X)আর তাই একগাদা উপসর্গ নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুটি একজন মেয়ে হিসেবেই বড় হতে থাকে।

উইলিয়াম টার্নার নামক একজন এন্ডোক্রাইনলজিস্ট (endocrinologist) বা হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম এই রোগটি বর্ননা করেন আর তার নাম অনুসারেই এ রোগের নাম করন করা হয়। যদিও মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় ই এই রোগটি নির্নয় করা সম্ভব তবে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুটির বয়সন্ধির আগে রোগটি ধরা পরেনা।

অভিভাবকের প্রথম অভিযোগ থাকে এই যে মেয়েটি তার বয়স অনুযায়ী লম্বা হচ্ছেনা (short stature)তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে খর্বাকৃতি ছাড়াও মেয়েটি শরীরে আরো উপসর্গ ধারন করে যেমন ঘাড় অনেক মোটা হওয়া (webbing of neck), কান গুলো অপেক্ষাকৃত নীচে থাকে (low set ears), পেছন দিকে মাথার তালু ছাড়িয়ে ঘাড় থেকেও চুল ওঠা (low cut hairline), হাত ও পা ফুলে যাওয়া (lymphoedema), আঙ্গুল ছোট হওয়া, মুখ মাছের মুখের (fish mouth) মত হওয়া ইত্যাদি। শিশুটির বুক অনেক চওড়া থাকে (shield chest) এবং স্তনবৃন্ত  গুলো একটা আরেকটা থেকে অনেক দূরে দূরে থাকে(widely spaced nipple)

এমন রোগে আক্রান্ত শিশুটির অনেক সময়ই বুদ্ধিশুদ্ধি ভালো থাকতে দেখা যায় তবে এদের অনেকেই আবার কম বুদ্ধি সম্পন্ন হয়। এদের গনিতে পারদর্শিতা অপেক্ষাকৃত কম থাক, কম থাকতে পারে শ্রবন ক্ষমতা এমন কি দৃষ্টি শক্তিও।

ভালো মত পরীক্ষা নিরিক্ষা করলে দেখা যায় এদের হার্টেও বেশ কিছু সমস্যা থাকে যেমন মহা ধমনী সরু হয়ে যাওয়া (coarctation of aorta), ভাল্ভ সরু হয়ে যাওয়া (aortic stenosis)তেমনি অনেকের কিডনিও থাকে রোগাক্রান্ত (Horshoe Kidney)শিশুটির একটি ক্রোমজম কম থাকার কারনে তার ডিম্বাশয় শুকিয়ে যায় (streak ovaries) যার ফলে স্বাভাবিক বয়সে তার বয়সন্ধি শুরু হয়না। মাসিক (menstruation) শুরু না হওয়ার কারনেও অনেক সময় অভিভাবক চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হন। খর্বাকৃতির এমন একটি মেয়ে শিশুর অভিভাবক অনেক সময়ই প্রচন্ড হতাশায় ভোগেন এবং মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যান।

মনে রাখতে হবে টার্নার সিন্ড্রম এর চিকিৎসা আছে, আর এ রোগটিতে আক্রান্ত হওয়া শিশুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়।  আগেই জানানো হয়েছে গর্ভাবস্থাতেও এমনিওসেন্টেসিস (amniocentesis) এর মাধ্যমে এ রোগ নির্নয় করা সম্ভব। জন্মের পরেও এ রোগ নির্নয় হলে সমস্যা নেই। রোগটি নিশ্চিত করতে ক্যারিওটাইপিং (Kariotyping) নামে একটি পরীক্ষা করতে হয়।

শুরুতেই একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের (endocrinologis) তত্বাবধানে থেকে চিতিৎসা শুরু করতে হবে। স্বাভাবিক লম্বা হতে হলে তাকে সঠিক বয়সে Growth Hormone দিতে হবে। যেহেতু শিশুটি একটি মেয়ে এবং তার ডিম্বাশয় পরিপূর্ন নয় তাই পূর্নাঙ্গ নারী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাকে সঠিক বয়সে অবশ্যই ইস্ট্রোজেন (estrogen) হরমোন দিতে হবে। এসব হরমোনের প্রভাবে শিশুটি একজন স্বাভাবিক কিশোরী হিসেবে বড় হতে থাকবে এবং পরিপূর্ন নারীতে পরিণত হবে। দীর্ঘস্থায়ী এ চিকিৎসা সঠিক ভাবে চালিয়ে গেলে একসময় তার পক্ষে গর্ভধারন করাও সম্ভব।

তাই হতাশ হলে চলবেনা, যেই বয়সেই এই রোগটি নির্নয় হোক না কেন এর ফলপ্রসু চিকিৎসা রয়েছে। টার্নার সিন্ড্রমের অনেক রোগীই স্বাভাবিক মেধাসপন্ন হয় এবং সম্পূর্ন স্বাভাবিক একটি জীবন ফিরে পেতে পারে। ধৈর্য্য ধরে শুধু চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াটাই তখন একমাত্র কষ্টের কাজ হতে পারে।