সুস্বাস্থ্য.কম

সুস্থ্য দেহ ও সতেজ মনের জন্য...

  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size

একিউট স্ট্রেস রিয়্যাকশন

E-mail Print

১। হঠাৎ করে আমাদের যাপিত জীবনে এমনকিছু মুহূর্ত চলে আসে যা একেবারেই অনাকাংক্ষিত। হুট করে ঘটে যায় এমন কিছু যা আমাদের কল্পনারও বাইরে। ঠিক সেই সময় পরিবর্তিত প্রতিকুল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে যেয়ে আমাদের মনোজগতে তৈরী হয় আলোড়ন। আমাদের আচরণ, চিন্তা সবকিছু হয়ে যায় এলোমেলো বিহবলতা থেকে হতবিহবলতার দিকে চলে যাই আমরা। আসন্ন কোন বিপদ বা হুমকি থেকে আমাদের মনে তৈরী হয় তীব্র উৎকন্ঠা আর কোন ক্ষতি হয়ে গেলে তৈরী হয় বিষণ্নতা। অনেকসময় এই উৎকন্ঠা আর বিষণ্নতা একসাথে থাকে কারন আসন্ন বিপদ এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রায়শই একসাথে ঘটে।

যেমন সিডর এর মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, বড় দুর্ঘটনা ইত্যাদি। এসব মুহূর্তে কেবল হারানোর বেদনাই থাকে না সেই সাথে থাকে আরো ক্ষতি হবার ভয় বা হুমকি।

সেসময় যে ধরণের মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় একিউট স্ট্রেস রিয়্যাকশন বা তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যা। অন্য কোন ধরণের মানসিক রোগের উপস্থিতি ছাড়া কেবলমাত্র দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা বা অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতির কারনে এ সমস্যা হতে পারে। এ সমস্যা কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

২। একিউট স্ট্রেস রিয়্যাকশন এর লক্ষণসমুহঃ

  • প্রাথমিক অবস্থায় হতবিহবল হয়ে পড়া
  • চেতনা ও মনোযোগ কমে যাওয়া
  • উদ্দীপনায় সাড়া না দেয়া, চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্বিকার থাকা
  • প্রকৃত ঘটনা বা বাস্তবতাকে অস্বীকার করা
  • দুর্যোগ মুহূর্তটি মনে করতে না পারা বা সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া
  • দুর্যোগকে মনে করিয়ে দিতে পারে এমন উদ্দীপনা সমূহকে এড়িয়ে চলা
  • হাত পায়ে অবশবোধ করা
  • কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মাত্রাতিরিক্ত অসংলগ্ন কথা বলা
  • ঘুম না হওয়া
  • অতিমাত্রায় টান টান উত্তেজিত থাকা
  • ঘাম হওয়া, বুক ধরফর করা, হাত-পা কাঁপা
  • পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা কমে যাওয়া
  • পরবর্তীতে এ রোগে আক্রান্তরা নিজেকে গুটিয়ে ফেলতে পারেন
  • উত্তেজিত আচরণ করতে পারেন বা হয়ে যেতে পারেন অতিরিক্ত কর্মচঞ্চল
  • অনেকসময় অতিরিক্ত ক্রোধান্বিত হয়ে ছুটে যাওয়া
  • অতিশয় নম্র-ভদ্র ব্যক্তি অপ্রত্যাশিতভাবে অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে পারেন
  • অসামঞ্জস্যপুর্ণ আচরণ করা
  • অতিশয় শোকাহত হওয়া

৩। সবারক্ষেত্রে সবসময় একই রকমভাবে লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায় না। প্রতিকুল পরিস্থিতির ধরণ এবং পরিস্থিতি আয়ত্ব করার ব্যক্তিগত দক্ষতা বা কোপিং মেকানিজম এর উপর লক্ষণ নির্ভর করে। একই ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির মানসিক প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন হতে পারে। যাদের প্রতিকুল পরিস্থিতি সামাল দেবার দক্ষতা কম তারাই তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বা অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা আলাদা বিষয় কিন্তূ এই দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বা অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতি ঘটে গেলে যারা পরিস্থিতির শিকার তাদের সাথে এমন আচরণ করতে হবে যাতে তারা নিজেদের করুণার পাত্র মনে না করেন আবার উপেক্ষিত বা ঘৃণিত বোধ না করেন। তাদের সাথে সমবেদী (এমপ্যাথেটিক) আচরণ করতে হবে। ঘটনাটি সম্পর্কে তার সাথে খোলামেলা আলাপ আলোচনা করতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ডিব্রিফিং। যা ঘটেছে সেই প্রকৃত ঘটনা তাকে ধীরে ধীরে জানাতে হবে। অহেতুক তাদের উপর কোন কিছু জানার জন্য চাপ দেয়া যাবে না। তাদের আবেগের মূল্য দিতে হবে তাদের প্রতি সহানুভুতি ব করুণা না দেখিয়ে সাহস দিতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে এই বিপদে আপনি একা নন, আপনার সাথে আমরাও আছি এবং সবাই মিলে নিশ্চয়ই এই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাবো। তাদের ক্ষতি কতটুকু হয়েছে তা নিরূপণ করতে হবে এবং তাকে বোঝাতে হবে যে তিনি আরো অনেক বড় ক্ষতি থেকে হয়ত বেঁচে গেছেন বা এর চাইতে আরো বড় ক্ষতি তার হতে পারত।

এছাড়া প্রতিকুল পরিবেশে কিভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয় সে বিষয়ে তাকে সহ অন্যদেরও কিছুটা প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সিলর বা মনোচিকিৎসক এর সহায়তায় বিশেষ কাউন্সিলিং বা সাইকোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনে কেবলমাত্র মনোচিকিৎসকের পরামর্শে উৎকন্ঠাবিনাশী (এংজিওমাইটিক) ও বিষণ্নতারোধী (এন্টিডিপ্রেসেন্ট) ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। রিলাক্সেশন, মেডিটেশন অনেকসময় উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

৪। প্রত্যেক পেশাজীবি এমনকি সাধারণ মানুষদের জন্য নিয়মিত স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ থাকা জরুরী। বিশেষত যেসব পেশাজীবিগণ প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করেন বা যাদের যেকোন সময় তীব্র মানসিক চাপ বা অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হতে পারে তাদের জন্য এ ধরণের প্রশিক্ষণ নেয়া দরকার। তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে এ ধরণের প্রশিক্ষণ নেয়া উচিত। পৃথিবীর বহু দেশে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ইউনিট এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে।

{flike}

 

সুস্বাস্থ্য সুপারিশ করুন

এই সাইটের সকল তথ্য শুধুমাত্র চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞানার্জন ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকাশিত যা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের বিকল্প নয়রোগ নির্নয় ও তার চিকিৎসার জন্য সংশ্লিস্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়